আইনজীবীর পোশাকে কলকাতা হাইকোর্টে মমতা, ভোট-পরবর্তী হিংসা মামলায় তুমুল রাজনৈতিক চর্চা
কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বৃহস্পতিবার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটল। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎই কলকাতা হাইকোর্টে উপস্থিত হন আইনজীবীর পোশাকে। সাদা শার্ট, কালো কোট এবং আইনজীবীদের নির্দিষ্ট পোশাকে তাঁকে আদালত চত্বরে দেখা যেতেই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে শুরু হয়ে যায় ব্যাপক চর্চা। মুহূর্তের মধ্যে সেই ছবি ভাইরাল হয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
সূত্রের খবর, রাজ্যে ভোট-পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি চলছিল কলকাতা হাইকোর্টে। সেই মামলাকে কেন্দ্র করেই আদালতে পৌঁছন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু আদালতে উপস্থিত হওয়াই নয়, তিনি নিজেই মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য রাখতে পারেন বলে জল্পনা শুরু হয় রাজনৈতিক এবং আইনজীবী মহলে। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের আইনজীবী ও সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ আরও একাধিক আইনজীবী।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে তৈরি হয় তীব্র কৌতূহল। আদালতের বাইরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয় যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। আদালত চত্বরে উপস্থিত বহু আইনজীবী এবং সাধারণ মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে ভিড় জমাতে শুরু করেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র আইনি লড়াই নয়, বরং রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বাংলার রাজনীতিতে বর্তমানে যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই আদালতে এভাবে সরাসরি উপস্থিত হয়ে তিনি কার্যত বোঝাতে চাইলেন যে বিরোধী শিবিরের অভিযোগের বিরুদ্ধে তিনি আইনি এবং রাজনৈতিক দুই ময়দানেই লড়াই করতে প্রস্তুত।
প্রসঙ্গত, বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর এবং হিংসার অভিযোগ উঠতে শুরু করে। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, তাদের কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলা চালানো হয়েছে, বহু পার্টি অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে এবং বিরোধীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অশান্তির পরিবেশ তৈরি করছে। অন্যদিকে বিজেপির অভিযোগ, ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে এবং বিরোধী দলের কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন।
এই আবহেই কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হয় একাধিক জনস্বার্থ মামলা। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, ভোট-পরবর্তী সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনা ঘটেছে। আদালতের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তার আবেদন জানানো হয়েছে।
হাইকোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। বিজেপির একাংশ দাবি করেছে, আদালতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিক সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছেন। তাঁদের মতে, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার অবনতির দায় এড়াতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষার জন্যই আদালতে পৌঁছেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আদালতে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি বলেন, বাংলা কোনও বুলডোজার রাজনীতি মানে না। তিনি দাবি করেন, বাংলার মানুষকে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যাবে না এবং আইনের মাধ্যমেই লড়াই চলবে। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেও শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাকে শুধুমাত্র আদালতে উপস্থিতি বলে দেখলে ভুল হবে। কারণ বাংলার রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই প্রতীকী বার্তা দিতে পছন্দ করেন। কখনও পথে নেমে আন্দোলন, কখনও সাধারণ মানুষের পোশাকে সভা, আবার কখনও প্রশাসনিক বৈঠকে কঠোর অবস্থান প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যেই রাজনৈতিক বার্তা থাকে। এবার আইনজীবীর পোশাকে আদালতে পৌঁছে তিনি সম্ভবত বোঝাতে চাইলেন যে তিনি নিজে লড়াইয়ের সামনের সারিতে রয়েছেন।
সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই ছবি ঘিরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ লিখেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই করছেন। আবার কেউ কটাক্ষ করে বলেছেন, এটা নিছক রাজনৈতিক নাটক। ফেসবুক, এক্স (পুরনো টুইটার), ইনস্টাগ্রাম সর্বত্র ভাইরাল হয়ে যায় তাঁর আদালতে যাওয়ার ভিডিও এবং ছবি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কলকাতা হাইকোর্ট অতীতেও ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে। ২০২১ সালেও আদালত রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কড়া মন্তব্য করেছিল এবং কয়েকটি গুরুতর ঘটনার তদন্তে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। একদিকে বিজেপি বাংলায় নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের রাজনৈতিক জমি ধরে রাখতে মরিয়া। এই আবহে আদালতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি উপস্থিতি আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এখন সবার নজর কলকাতা হাইকোর্টের পরবর্তী শুনানির দিকে। আদালত এই মামলায় কী নির্দেশ দেয়, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কী পর্যবেক্ষণ করে এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের অভিযোগে তদন্ত কোন পথে এগোয় তা নিয়েই চর্চা তুঙ্গে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, আইনজীবীর পোশাকে আদালতে হাজির হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের একবার বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এলেন।