logo
Select Language
Hindi
Bengali
Tamil
Telugu
Marathi
Gujarati
Kannada
Malayalam
Punjabi
Urdu
Oriya

স্টেশনের ছোট দোকানে লক্ষাধিক টাকার খেলা! নেপথ্যে কি শুধু খাটুনি, নাকি অন্য কিছু?

​বিশেষ প্রতিনিধি, ২ জুন ২০২৬,কলকাতা: প্রতিদিন লোকাল ট্রেনের ভিড়, হকারদের চিৎকার আর চাকা ঘোরার শব্দের মাঝেই নিঃশব্দে চলছে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। রেললাইনের ধার ঘেঁষে যে ছোট ছোট দোকানগুলোকে আমরা অত্যন্ত সাধারণ ভাবি, তাদের মাসিক উপার্জনের খতিয়ান শুনলে কর্পোরেট চাকুরিজীবীদেরও চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। দমদম বা সোদপুরের মতো ব্যস্ত স্টেশনের ভেতরের কিছু চাঞ্চল্যকর অর্থনৈতিক হিসাব এবার সামনে আসছে।
​আমাদের এক বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে স্টেশনের ভেতরের এই ‘অদৃশ্য’ অর্থনীতির এক বাস্তব খতিয়ান।
​দমদম স্টেশন: ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের ‘কচুরি তত্ত্ব’
​দমদম স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে অবস্থিত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় দোকান—"অতনু কচুরি সেন্টার"। বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার নিত্যযাত্রীর ক্ষিদে মিটিয়ে আসছে এই দোকান। গুণগত মানও অনবদ্য। কিন্তু এর দৈনিক বিক্রির হিসাবটা ঠিক কেমন?
​একটি সাধারণ পরিসংখ্যান দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে:
​বিক্রির হার: গড়ে প্রতি ২ মিনিটে অন্তত একজন ক্রেতা আসেন (যদিও পিক আওয়ারে ৪-৫ জন একসাথে দাঁড়িয়ে থাকেন)।
​দাম: ২০ টাকায় ৩ পিস কচুরি। অর্থাৎ, ২ মিনিটে ব্যবসা ২০ টাকা।
​১ ঘণ্টার আয়: ৩০ \times ২০ = ৬০০ টাকা।
​দৈনিক আয় (১০ ঘণ্টা হিসাবে): ৬০০ \times ১০ = ৬,০০০ টাকা।
​মাসিক মোট ব্যবসা: ৬,০০০ \times ৩০ = ১,৮০,০০০ টাকা।
​কাটমানির অন্ধকার দিক: অভিযোগ উঠছে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গেলে দিতে হয় মোটা অঙ্কের ‘তোলা’ বা কাটমানি। স্থানীয় সূত্রে দাবি, প্ল্যাটফর্মের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের প্রতি মাসে প্রায় ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। যদি বাজারের মন্দা বা এই কাটমানির খরচও বাদ দেওয়া যায়, তাও প্রতি মাসে এই একটি সাধারণ দোকান থেকে নেট মুনাফা থাকে প্রায় ১ লক্ষ টাকা!
​বিগত ১০-১৫ বছর ধরে এই হিসাবই চলে আসছে। প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল পরিমাণ ‘অঘোষিত’ উপার্জনের হিসাব কি আদৌ কোথাও নথিভুক্ত হয়? ৩-৪ জন যুবকের সংসার এই দোকানটি দিয়ে চললেও, এই কর ফাঁকি এবং তোলার রাজনীতির শেষ কোথায়?
​সোদপুর স্টেশন: ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের ‘চা-বিপ্লব’
​একই চিত্র দেখা গেল সোদপুর স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি থাকা একটি ছোট চা দোকানেও। দু’টি ছেলে ভোর ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চা বিক্রি করেন। এলাকার সেরা চা পাওয়া যায় এখানে, যার দাম ৬ টাকা এবং ১০ টাকা।
​বিস্কুটের হিসাব বাদ দিয়ে যদি শুধু ১০ টাকার চায়ের হিসাব ধরা হয়:
​ঘণ্টায় ক্রেতা: গড়ে ১৫-২০ জন।
​দৈনিক আয় (১২ ঘণ্টা হিসাবে): ১৫ \times ১২ \times ১০ = ১,৮০০ টাকা।
​মাসিক মোট ব্যবসা: ১,৮০০ \times ৩০ = ৫৪,০০০ টাকা।
​একটি সাধারণ চায়ের দোকান থেকে মাসে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকার ব্যবসা হচ্ছে অনায়াসেই।
​আসল সত্যটা কী?
​শুনতে হয়তো অনেকের খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু এটাই বর্তমানের রূঢ় বাস্তব—"স্টেশনের এই তথাকথিত ছোট ব্যবসায়ীদের কেউই আসলে গরিব নন।"
​স্টেশন চত্বরের এই বিশাল অর্থনীতি পুরোপুরি চলে ক্যাশ বা নগদ টাকায়। ফলে এই বিশাল অঙ্কের লেনদেন সবসময়ই আয়কর বা সরকারি নজরদারির বাইরে থেকে যায়। একদিকে যেমন এই দোকানগুলো সাধারণ মানুষের দৈনিক চাহিদা মেটাচ্ছে এবং যুবকদের কর্মসংস্থান করছে, তেমনই অন্যদিকে এই ‘কালো টাকা’ ও ‘তোলাবাজি’-র চক্র স্টেশন চত্বরগুলোকে গ্রাস করে চলেছে।
​এখন দেখার, এই হিসাব বহির্ভূত ব্যবসার ওপর কখনো নিয়মের রাশ টানা হয়, নাকি এভাবেই বছরের পর বছর ধরে চলবে প্ল্যাটফর্মের ভেতরের এই লক্ষ টাকার খেলা।

73
2078 views

Comment