logo
Select Language
Hindi
Bengali
Tamil
Telugu
Marathi
Gujarati
Kannada
Malayalam
Punjabi
Urdu
Oriya

ভালোবাসার শক্তি ও হারানোর বেদনা: ভারতে চিকিৎসাজনিত অবহেলার বিরুদ্ধে এক প্রবাসীর একক লড়াই


​কলকাতা, নিজস্ব প্রতিনিধি: জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি বা বিপর্যয় মানুষকে অনেক সময় এক নতুন পথের দিশা দেখায়। ডঃ কুনাল সাহার ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। ১৯৯৮ সালের ২৮শে মে চিকিৎসকদের মারাত্মক ভুলের কারণে তাঁর স্ত্রী অনুরাধার অকাল মৃত্যু হয়। সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতে চিকিৎসাজনিত অবহেলার বিরুদ্ধে এক আপসহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির এই এইচআইভি/এইডস গবেষক।
​তারই প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংস্থা ‘পিপল ফর বেটার ট্রিটমেন্ট’ (PBT) আজ ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থার অজ্ঞতা, দুর্নীতি এবং ভয়কে উন্মোচন করার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।
​একটি দুর্ঘটনা, প্রেম এবং ট্র্যাজিক পরিণতি
​১৯৮৫ সালে কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়ার ট্রেন মিস করার পর একটি বনভোজনে অনুরাধার সঙ্গে দেখা হয় কুনালের। কুনাল জানান, অনুরাধা তাকে একটি কাকতালীয় বিষয় দেখিয়েছিলেন—তার ডাকনাম ‘অনু’-র বানানটি ‘কুনাল’ নামের ঠিক মাঝখানে উল্টো করে লেখা ছিল। অনুরাধা বলেছিলেন, “আমি ঠিক তোমার কেন্দ্রবিন্দুতে আছি।”
​বিয়ের ১১ বছর পর, যখন অনুরাধার শিশু মনোবিজ্ঞানের পড়াশোনা শেষ এবং তারা ওহাইওতে নতুন করে সংসার ও সন্তান লাভের স্বপ্ন দেখছিলেন, তখনই বিপর্যয় নেমে আসে। কলকাতার এক নামী চিকিৎসকের কাছে সামান্য জ্বর ও র‍্যাশের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ভুল স্টেরয়েডের (Depo Medrol) অতিরিক্ত মাত্রার কারণে সেপসিস হয়ে মারা যান অনুরাধা। কুনাল সাহার ভাষায়, “সে চিকিৎসকের অজ্ঞতা এবং অহংকারের এক মারাত্মক সংমিশ্রণে মারা গিয়েছিল।”
​দীর্ঘ আইনি লড়াই ও ঐতিহাসিক জয়
​বন্ধুমহলের নেতিবাচক মন্তব্য ও বাধা সত্ত্বেও দমে যাননি কুনাল। ২০০১ সালে তিনি ‘পিপল ফর বেটার ট্রিটমেন্ট’ গঠন করেন এবং অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মামলা লড়েন।
​২০০৯ সালের ঐতিহাসিক রায়: দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় লড়াইয়ের পর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অভিযুক্ত চিকিৎসকদের চিকিৎসাজনিত অবহেলার (Malpractice) জন্য দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাদের লাইসেন্স বাতিল করে।
​ক্ষতিপূরণ ও ত্যাগ: আদালত সাহাকে প্রায় ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২০ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে কুনাল সাহা একটি হলফনামা দিয়ে জানান যে, এই অর্থের একটি পয়সাও তিনি নিজের জন্য ব্যবহার করবেন না। সম্পূর্ণ অর্থ ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির জন্য উৎসর্গ করেন তিনি, যার কারণে পরবর্তী সময়ে নিজের পকেটের টাকা খরচ করতে করতে তিনি দেউলিয়া (Bankruptcy) পর্যন্ত হয়ে যান।
​ভারতের চিকিৎসা সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের হাওয়া
​ব্রিটেনের বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (BMJ)-এর একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতে চিকিৎসকদের ভুল বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা অত্যন্ত কঠিন, কারণ এখানে চিকিৎসকেরা সহকর্মীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পান। তবে কুনাল সাহার এই লড়াইয়ের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
​একটি তুলনামূলক চিত্র:
১৯৯৮ সালে (যে বছর অনুরাধা মারা যান) ভারতে চিকিৎসায় অবহেলার কারণে কোনো চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল হওয়ার নজির ছিল না। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে কেবল এক মাসেই (জানুয়ারি) নিম্নমানের চিকিৎসার কারণে আটজন চিকিৎসক তাদের লাইসেন্স হারিয়েছেন।
​কুনাল সাহার এই লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে জেনেভায় কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিক ডঃ কে শ্রীকার রেড্ডীও (যিনি ২০০৩ সালে ভুল চিকিৎসায় স্ত্রী ও সন্তান হারান) আদালতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। রেড্ডী জানান, “ডঃ সাহা সচেতনতা তৈরি করে এবং মানুষের জীবন বাঁচিয়ে ভারতের চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছেন।”
​লড়াই এখনো বাকি
​২০১৪ সালে পাস হওয়া ভারতের ‘হুইসেল ব্লোয়ার সুরক্ষা আইন’ সরকারি খাতের কর্মীদের কিছুটা নিরাপত্তা দিলেও বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। আইনটির এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
​কুনাল সাহা প্রতিদিন ভারত থেকে অসংখ্য ভুক্তভোগীর চিঠি পান। তিনি মনে করেন, চিকিৎসা ব্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তন করাই তাঁর নিয়তি। তিনি বলেন, “ভারতে চিকিৎসাক্ষেত্রে দুর্নীতি আক্ষরিক অর্থেই জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। আমি লড়াই চালিয়ে যাব যাতে এই ব্যবস্থাটিকে একটি সৎ ও ন্যায্য ব্যবস্থায় পরিণত করতে পারি। বিশাল পাথরটি অবশেষে গড়াতে শুরু করেছে।”

27
2455 views

Comment