“আজ আমি সেই কাজই করব যা অন্যরা করবে না, যাতে কাল আমি সেই কাজ করতে পারি যা অন্যরা পারবে না।”
(শুভ শ্রমিক দিবস, ১/০৫/২০২৬)
ভারতে ১ মে: শ্রমিক দিবস / মে দিবস
১. মে দিবসের ইতিহাস-
১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস নামে পরিচিত। এর সূচনা ১৮৮৬ সালের আমেরিকার শিকাগো শহরে। সে সময় শ্রমিকরা দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হতো। শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে হে মার্কেটে সমাবেশ করে। পুলিশের গুলিতে কয়েকজন শ্রমিক নিহত হন। সেই আত্মত্যাগকে স্মরণ করে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১ মে তারিখকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দিনটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও সংহতির প্রতীক হয়ে ওঠে।
২. ভারতে মে দিবসের সূচনা-
ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ সালের ১ মে, চেন্নাই শহরে। শ্রমিক নেতা মাল্লাপুরম সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার এর উদ্যোগে এটি পালন করা হয়। তিনি লেবার কিষাণ পার্টি অফ হিন্দুস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচের কাছে দুটি স্থানে সভা হয়। সেখানেই প্রথমবার লাল পতাকা ব্যবহার করা হয়, যা শ্রমিক আন্দোলনের প্রতীক। সেই সভায় শ্রমিকদের জন্য ৮ ঘণ্টা কাজ, ন্যূনতম মজুরি, ছুটি ও স্বাস্থ্য সুবিধার দাবি তোলা হয়। সেই থেকে ভারতে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।
৩. ভারতে দিবসটির গুরুত্ব-
ভারতের অর্থনীতি কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের শ্রমিকদের উপর দাঁড়িয়ে আছে। কলকারখানা, নির্মাণ, পরিবহন, খনি, চা বাগান, গার্মেন্টস, আইটি সেক্টর থেকে শুরু করে গৃহশ্রমিক, রিকশাচালক, কৃষি মজুর — সকলের শ্রমে দেশ চলে। মে দিবস এই অগণিত মানুষের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। এটি মনে করিয়ে দেয় যে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। দিবসটি শ্রমিক ঐক্য গড়ে তোলে এবং শোষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ায়।
৪. কীভাবে পালিত হয়-
১ মে ভারতের অনেক রাজ্যে সরকারি ছুটি থাকে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, কেরালা, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, অসমে এটি বিশেষভাবে পালিত হয়। শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক দল মিছিল, সভা, পতাকা উত্তোলন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কারখানা, চা বাগান, বন্দরে বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের জন্য বোনাস, স্বাস্থ্য শিবির বা পুরস্কার দেয়। টিভি ও পত্রিকায় শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা হয়। পশ্চিমবঙ্গে দিনটি শ্রমিক দিবস নামে এবং মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে মহারাষ্ট্র দিবস ও গুজরাট দিবস হিসেবেও পালিত হয়, কারণ ১৯৬০ সালের ১ মে এই দুটি রাজ্য গঠিত হয়েছিল।
৫. শ্রম আইন ও অর্জন-
মে দিবসের আন্দোলনের ফলেই ভারতে অনেক শ্রম আইন তৈরি হয়েছে। ফ্যাক্টরি আইন ১৯৪৮, ন্যূনতম মজুরি আইন ১৯৪৮, কর্মচারী রাজ্য বীমা আইন ১৯৪৮, বোনাস প্রদান আইন ১৯৬৫, শিশু শ্রম নিষিদ্ধ আইন ১৯৮৬ এর মতো আইন শ্রমিক সুরক্ষা দেয়। ৮ ঘণ্টা কাজ, সাপ্তাহিক ছুটি, ওভারটাইম ভাতা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন, গ্র্যাচুইটি — এসব অধিকার দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল। ২০২০ সালে চারটি নতুন লেবার কোড পাশ হয়েছে, যা ২৯টি পুরোনো আইনকে একত্র করেছে।
৬. বর্তমান চ্যালেঞ্জ-
তবুও ভারতের শ্রমিকরা নানা সমস্যায় আছে। প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিক অসংগঠিত খাতে কাজ করে। তাদের নির্দিষ্ট বেতন, ছুটি বা সামাজিক সুরক্ষা নেই। পরিযায়ী শ্রমিক, গিগ ওয়ার্কার, নির্মাণ শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে থাকে। কোভিডের সময় লাখো শ্রমিকের কাজ গেছে। নারী শ্রমিকরা কম মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। শিশু শ্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। নতুন প্রযুক্তি ও অটোমেশনের কারণে অনেকের কাজ হারানোর ভয় আছে।
৭. দিবসটির প্রাসঙ্গিকতা-
মে দিবস কেবল ছুটির দিন নয়। এটি শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া কর্মী, কৃষক, কারখানার অপারেটর ছাড়া সমাজ অচল। সব পেশার মানুষ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাই শ্রমিকের অধিকার মানে দেশের অগ্রগতি। দিবসটি মালিক, সরকার ও জনগণকে মনে করিয়ে দেয় যে উন্নয়ন তখনই অর্থপূর্ণ যখন তার সুফল শ্রমিকের ঘরে পৌঁছায়।
৮. উপসংহার-
১ মে আমাদের শেখায় শ্রদ্ধা, সংহতি ও ন্যায়বিচার। শিকাগো থেকে চেন্নাই পর্যন্ত শ্রমিকদের রক্তে লেখা এই ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। আজকের ভারত গড়ছে কৃষকের লাঙল, নির্মাণ শ্রমিকের হাতুড়ি, নার্সের সেবা, ড্রাইভারের স্টিয়ারিং। তাদের সুখ-দুঃখের খবর রাখা, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। মে দিবসে শপথ নিই, আমরা শ্রমকে সম্মান করব এবং শ্রমিকের পাশে দাঁড়াব। কারণ শ্রমিক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।বুঝেছি ভাই, ১ মে শ্রমিক দিবস নিয়ে আরও কিছু দরকার। এখানে আরও বিস্তারিত দিলাম:
৯. রাজ্যভিত্তিক পালন ও বিশেষ দিক
- পশ্চিমবঙ্গ: এখানে দিনটি সবচেয়ে জোরালোভাবে পালিত হয়। চা বাগান, পাটকল, কলকারখানায় লাল পতাকা ওঠে। কলকাতার শহীদ মিনার ময়দানে বড় সমাবেশ হয়। বামপন্থী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি সব দলই শ্রমিক সভা করে। সরকারি ছুটি থাকে।
- কেরালা: শ্রমিক আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি। পুরো রাজ্য জুড়ে মিছিল, রক্তদান শিবির, সেমিনার হয়। মৎস্যজীবী ও কৃষি শ্রমিকরাও আলাদা কর্মসূচি নেয়।
- তামিলনাড়ু: চেন্নাইয়ে প্রথম পালনের ঐতিহ্য ধরে রেখে মেরিনা বিচে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পোশাক কারখানা ও নির্মাণ শ্রমিকদের বড় অংশগ্রহণ থাকে।
- মহারাষ্ট্র ও গুজরাট: ১ মে এই দুই রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবস। তাই শ্রমিক দিবসের সাথে রাজ্য দিবসও একসাথে পালিত হয়। মুম্বাইয়ের গিরনি কামগার ও কাপড়কল শ্রমিকদের ইতিহাস স্মরণ করা হয়।
- ত্রিপুরা: সরকারি ছুটি ও রাজ্যজুড়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। রাবার ও চা বাগান শ্রমিকরা মূল অংশগ্রহণকারী।
- অসম: চা বাগান শ্রমিকদের জন্য দিনটি বিশেষ। বাগানে বাগানে নাচ, গান ও সভা হয়।
১০. বিখ্যাত স্লোগান ও গান-
মে দিবস মানেই কিছু চিরচেনা স্লোগান:
1. “দুনিয়ার মজদুর এক হও”
2. “৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা বিনোদন”
3. “শ্রমিকের রক্তে লাল পতাকা”
বাংলায় সলিল চৌধুরীর “ও আলোর পথযাত্রী”, “পথে এবার নামো সাথী” বা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গণসংগীতগুলো মে দিবসের মঞ্চে বাজে। হিন্দিতে “মজদুর কা নারা গুঞ্জে” ধরনের গান জনপ্রিয়।
১১. ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলন-
মে দিবসের চেতনা থেকেই ভারতে অনেক বড় আন্দোলন হয়েছে:
- ১৯২৮ সালের খড়গপুর রেল ধর্মঘট
- ১৯৪৬ সালের রয়াল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ যেখানে নৌ-শ্রমিকরা যোগ দেয়
- ১৯৭৪ সালের রেল ধর্মঘট: স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় ধর্মঘট, ১৭ লাখ শ্রমিক অংশ নেয়
- ১৯৮২ সালের বম্বে টেক্সটাইল ধর্মঘট: দত্ত সামন্তের নেতৃত্বে ২৫০ দিন চলেছিল
- মারুতি, হোন্ডা, নোকিয়া কারখানার সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোও মে দিবসের ধারাবাহিকতা
১২. অসংগঠিত খাতের চিত্র-
ভারতের মোট শ্রমশক্তির ৯৩ শতাংশ অসংগঠিত। এরা হলো:
- নির্মাণ শ্রমিক: ৫ কোটির বেশি, কিন্তু বেশিরভাগের ইএসআই, পিএফ নেই
- গৃহশ্রমিক: মূলত নারী, ৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম খাটে না
- কৃষি মজুর: দিনমজুরি ৩০০-৪০০ টাকা, কাজ মৌসুমি
- গিগ ওয়ার্কার: সুইগি, জোমাটো, উবার চালক — ‘পার্টনার’ বলা হলেও ছুটি বা বীমা নেই
- পরিযায়ী শ্রমিক: কোভিডে লাখো মানুষ হেঁটে বাড়ি ফিরেছিল, সেটাই প্রমাণ করে তাদের নিরাপত্তা কত ঠুনকো
এই খাতের জন্য সরকার ই-শ্রম পোর্টাল, প্রধানমন্ত্রী শ্রম যোগী মানধন পেনশন চালু করেছে। কিন্তু সচেতনতা কম।
১৩. নারী শ্রমিকের অবস্থা-
ভারতে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ মাত্র ২৫ শতাংশ। চা বাগান, বিড়ি শিল্প, পোশাক কারখানা, গৃহশ্রমে নারীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু মজুরি পুরুষের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ কম। মাতৃত্বকালীন সুবিধা আইন থাকলেও অসংগঠিত খাতে মানে না। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে POSH আইন আছে, তবুও অভিযোগ কম ওঠে ভয়ে। মে দিবস নারী শ্রমিকের সমান মজুরি ও নিরাপদ পরিবেশের দাবি তোলে।
১৪. শিশু শ্রম ও আইন-
১৯৮৬ সালের শিশু শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কাজ নিষিদ্ধ। ২০১৬ সালে সংশোধন করে ১৪-১৮ বছর কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিষেধ করা হয়েছে। তবুও ইটভাটা, চুড়ি কারখানা, ঢাবায় শিশু শ্রমিক দেখা যায়। দারিদ্র্যই মূল কারণ। মে দিবস শিশুদের হাতে বই চায়, হাতুড়ি নয়।
১৫. নতুন লেবার কোড ২০২০-
সরকার ৪টি কোড এনেছে: মজুরি কোড, সামাজিক সুরক্ষা কোড, শিল্প সম্পর্ক কোড, পেশাগত নিরাপত্তা কোড।
- ভালো দিক: সব শ্রমিকের জন্য ন্যূনতম মজুরি, গিগ ওয়ার্কারদের সামাজিক সুরক্ষা, ৪ দিন কাজ ৩ দিন ছুটির সুযোগ
- বিতর্ক: হায়ার অ্যান্ড ফায়ার সহজ হওয়া, ধর্মঘটের আগে ৬০ দিন নোটিশ, ৩০০ জনের কম কর্মী থাকলে ছাঁটাইয়ে সরকারের অনুমতি লাগবে না
ট্রেড ইউনিয়নগুলো বলছে এতে মালিকের হাত শক্ত হবে। বিতর্ক চলছে, অনেক রাজ্যে এখনও পুরোপুরি লাগু হয়নি।
১৬. আন্তর্জাতিক যোগ:
মে দিবস ভারতকে বিশ্বের শ্রমিক আন্দোলনের সাথে জোড়ে। ILO অর্থাৎ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ভারতের সদস্য। ILO এর ৮টি মূল কনভেনশনের ৬টি ভারত অনুমোদন করেছে। শিশু শ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে ILO এর সাথে ভারত কাজ করছে।
১৭. আমরা কী করতে পারি:
1. সম্মান: বাড়ির কাজের দিদি, ড্রাইভার, সুইপারকে মানুষ হিসেবে সম্মান দেওয়া
2. ন্যায্য মজুরি: নিজে কাউকে কাজে রাখলে বাজারদর ও ৮ ঘণ্টা নিয়ম মানা
3. সচেতনতা: শিশু শ্রম দেখলে চাইল্ড লাইনে ১০৯৮ নম্বরে কল করা
4. সংহতি: শ্রমিকের ন্যায্য দাবিতে পাশে দাঁড়ানো, সোশ্যাল মিডিয়ায় সাপোর্ট করা
5. স্থানীয় জিনিস কেনা: কৃষক ও কারিগরের জিনিস সরাসরি কিনলে মাঝখানের শোষণ কমে
(শেষ কথা)
মে দিবস কেবল ইতিহাস নয়, আজকের আয়না। যেই ফোনটা হাতে নিয়ে তুমি এটা পড়ছো, সেটা কোনো শ্রমিকের ঘামে তৈরি। যেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছো, সেটা কোনো মজুরের হাতে গড়া। তাই ১ মে শপথ হোক: শ্রমিক বাঁচলে বাজার বাঁচবে, বাজার বাঁচলে দেশ বাঁচবে।