logo
Select Language
Hindi
Bengali
Tamil
Telugu
Marathi
Gujarati
Kannada
Malayalam
Punjabi
Urdu
Oriya

রাজনীতি কেবল চাণক্য চাল নয়, দায়বদ্ধতাও বটে

গণতন্ত্রে রাজনীতি কেবল কৌশল, ক্ষমতার অঙ্ক বা “চাণক্য চাল”-এর খেলা নয়—এটি মূলত জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক পরিসরে প্রায়ই দেখা যায়, ক্ষমতা দখল ও ধরে রাখার কৌশলই যেন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, আর জনগণের স্বার্থ, তাদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান বা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের মর্মবস্তুকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
প্রাচীন রাষ্ট্রচিন্তক চাণক্য তাঁর নীতিতে রাজনীতির কৌশলগত দিককে গুরুত্ব দিয়েছিলেন—রাষ্ট্র পরিচালনায় বুদ্ধি, পরিকল্পনা ও প্রয়োজনে কঠোর সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেন। তবে আধুনিক গণতন্ত্রে সেই কৌশলই যদি একমাত্র চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে তা বিপজ্জনক। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে জনগণের মতামত, অংশগ্রহণ ও আস্থার ওপর। কৌশল যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গা দখল করে নেয়, তবে তা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।
ভারতের মতো বৃহৎ গণতন্ত্রে, যেখানে সংবিধান নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে, সেখানে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। ভারতীয় সংবিধান শুধু শাসকদের ক্ষমতা নির্ধারণ করে না, তাদের দায়িত্বও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে—যাতে রাষ্ট্র মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে এবং বৈষম্য কমায়। তাই রাজনৈতিক দল বা নেতাদের কাছে কৌশলগত জয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত জনগণের আস্থা অর্জন ও তা বজায় রাখা।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে এই দায়বদ্ধতা কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? নির্বাচনের সময় নানা প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের আশ্বাস বা সামাজিক ন্যায়ের কথা বলা হলেও, ভোটের পরে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিরোধীকে পরাস্ত করা বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ফলে জনস্বার্থের বিষয়গুলো—যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান—যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে হলে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলিকে বুঝতে হবে, জনগণ শুধু ভোটার নয়, তারা এই ব্যবস্থার আসল অংশীদার। তাদের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে নিয়মিত কাজের মাধ্যমে, স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তুলে এবং সমালোচনাকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে—তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের পাশাপাশি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজের উপর নজরদারি রাখা প্রয়োজন।
সর্বোপরি, গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন রাজনীতি কৌশলের সীমা পেরিয়ে সেবার আদর্শে পৌঁছায়। চাণক্য-নীতির কৌশল হয়তো রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া সেই রাজনীতি কখনোই স্থায়ী বা অর্থবহ হতে পারে না। গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সেই ভারসাম্যে—যেখানে কৌশল ও দায়বদ্ধতা একসঙ্গে কাজ করে, এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় জনগণের স্বার্থই।

13
645 views

Comment