logo
Select Language
Hindi
Bengali
Tamil
Telugu
Marathi
Gujarati
Kannada
Malayalam
Punjabi
Urdu
Oriya

তোমার ব্যবহার, তোমার অস্তিত্বহীন ! সমগ্র ভারত ভুগছে.

(অপরিশোধিত তেলের উপজাত ও তার ব্যবহার)
অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। শোধনাগারে পাতন প্রক্রিয়ায় একে বিভিন্ন তাপমাত্রায় ভেঙে অনেক উপজাত পাওয়া যায়। প্রতিটি উপজাতের আলাদা স্ফুটনাঙ্ক ও ব্যবহার আছে। চলো ৫০০ শব্দে সংক্ষেপে জেনে নিই।
১. পেট্রোলিয়াম গ্যাস -
শোধনের শুরুতে ২৫°C-এর নিচে যে হালকা গ্যাস বেরোয় তাকে পেট্রোলিয়াম গ্যাস বলে। এর মূল উপাদান মিথেন, ইথেন, প্রোপেন, বিউটেন। LPG সিলিন্ডারের গ্যাস এই ভগ্নাংশ থেকেই আসে। বাসাবাড়ির রান্না, গাড়ির জ্বালানি, কোল্ড স্টোরেজে শীতলীকরণে এটি ব্যবহৃত হয়। পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে ইথিলিন-প্রোপিলিন তৈরি করতেও লাগে।
২. পেট্রোল বা গ্যাসোলিন-
৪০-২০৫°C তাপে পাওয়া যায়। মোটরবাইক, গাড়ি, ছোট জেনারেটরের প্রধান জ্বালানি। দ্রুত দাহ্য বলে হালকা ইঞ্জিনে ব্যবহার উপযোগী। দ্রাবক হিসেবে ড্রাই-ক্লিনিং ও রং শিল্পেও লাগে।
৩. ন্যাপথা-
৬০-২০০°C রেঞ্জের হালকা তরল। সরাসরি জ্বালানি হিসেবে কম, কিন্তু পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের ‘ফিডস্টক’। ন্যাপথা ক্র্যাক করে ইথিলিন, প্রোপিলিন, বেনজিন, টলুইন তৈরি হয়, যা থেকে প্লাস্টিক, সিনথেটিক রাবার, ডিটারজেন্ট, রং, ওষুধ বানানো হয়।
৪. কেরোসিন-
১৫০-৩০০°C তাপে সংগ্রহ করা হয়। গ্রামের বাড়িতে আলো জ্বালানো, স্টোভ, হিটার-এর জ্বালানি হিসেবে পরিচিত। জেট ফুয়েল বা ATF মূলত উচ্চমানের কেরোসিন। শিল্পে দ্রাবক ও পরিষ্কারক হিসেবেও কাজে লাগে।
৫. ডিজেল-
২৫০-৩৫০°C রেঞ্জে পাওয়া ভারী তেল। ট্রাক, বাস, ট্রেন, জেনারেটর, কৃষি পাম্পসেটের জ্বালানি। পেট্রোলের চেয়ে কম দাহ্য, তাই ভারী ইঞ্জিনে নিরাপদ। শীতপ্রধান দেশে ‘উইন্টার ডিজেল’ ব্যবহার হয় যাতে জমে না যায়।
৬. লুব্রিকেটিং অয়েল-
৩৫০-৫০০°C ভগ্নাংশকে আরও প্রক্রিয়া করে লুব অয়েল বানানো হয়। ইঞ্জিন অয়েল, গিয়ার অয়েল, হাইড্রোলিক অয়েল সব এর মধ্যে পড়ে। ঘর্ষণ কমায়, যন্ত্রাংশ ঠান্ডা রাখে, মরচে পড়তে দেয় না।
৭. ফার্নেস অয়েল ও ফুয়েল অয়েল-
ভারী ভগ্নাংশ। বড় বয়লার, জাহাজ, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সিমেন্ট ও ইস্পাত কারখানায় তাপ উৎপাদনে লাগে। দামে সস্তা কিন্তু দূষণ বেশি, তাই এখন অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে বদলানো হচ্ছে।
৮. প্যারাফিন ওয়াক্স-
লুব অয়েলের পর মোম জাতীয় অংশ আলাদা করা হয়। মোমবাতি, ক্রেয়ন, প্যাকেজিং, কসমেটিক্স, ফলমূলের উপর পাতলা আস্তরণে ব্যবহার হয় যাতে তাজা থাকে।
৯. পেট্রোলিয়াম জেলি-
আধা-কঠিন, রঙহীন জেলি। ভ্যাসলিন নামে পরিচিত। ত্বকের ময়েশ্চারাইজার, লিপ বাম, ওষুধের বেস, মেশিনের মরচে রোধে লাগে।
১০. বিটুমিন বা অ্যাসফল্ট-
সবচেয়ে ভারী অংশ, প্রায় কঠিন। রাস্তা পিচ করতে, ছাদ ওয়াটারপ্রুফ করতে, ড্যাম্প-প্রুফিংয়ে ব্যবহার হয়। রাবার ও পেইন্ট শিল্পেও লাগে।
১১.পেট্রোলিয়াম কোক-
শেষ পর্যায়ের কঠিন কার্বন। অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত শিল্পে অ্যানোড তৈরিতে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। ‘সুই’ কোক ব্যাটারি ও গ্রাফাইট ইলেকট্রোডে লাগে।
১২.সালফার-
ক্রুডে থাকা সালফার আলাদা করে সার, সালফিউরিক অ্যাসিড, রাবার ভালকানাইজিংয়ে ব্যবহার হয়।
(অন্যান্য ব্যবহার):
শোধনের সময় পাওয়া বেনজিন, টলুইন, জাইলিন থেকে রং, কীটনাশক, সুগন্ধি, ওষুধ, বিস্ফোরক তৈরি হয়। পলিথিন, PVC, পলিস্টার, নাইলন—সব প্লাস্টিকের কাঁচামাল আসে এই উপজাত থেকেই। এমনকি সিনথেটিক ফাইবার, ডিটারজেন্ট, সার, কীটনাশক, প্রসাধনী, লাইফ-সেভিং ড্রাগ—সব কিছুর শিকড় ক্রুড অয়েলে।
ক্রুড অয়েল শুধু পেট্রোল-ডিজেল নয়, আধুনিক সভ্যতার প্রায় প্রতিটি জিনিসের সাথে জড়িয়ে। তবে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে কার্বন নিঃসরণ হয়, তাই এখন নবায়নযোগ্য শক্তি ও বায়ো-প্লাস্টিকের দিকে ঝোঁক বাড়ছে। তবু উপজাতগুলোর গুরুত্ব এখনও অপরিসীম, কারণ জ্বালানি থেকে ওষুধ—সবখানেই এর অবদান আছে।(অপরিশোধিত তেলের উপজাত না থাকলে সমাজে কী প্রভাব পড়বে):
অপরিশোধিত তেলের উপজাত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের শিরায়-উপশিরায় মিশে আছে। এগুলো হঠাৎ না থাকলে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে বড় ধাক্কা লাগবে। সংক্ষেপে ৫০০ শব্দে দেখে নিই।
১. যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে-
পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েল না থাকলে গাড়ি, বাস, ট্রাক, ট্রেন, বিমান সব অচল। অফিস-স্কুল যাওয়া, পণ্য পরিবহন, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স-দমকল সব বন্ধ। খাবার, ওষুধ, কাঁচামাল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছাবে না। ফলে বাজারে জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া হবে, কালোবাজারি বাড়বে।
২. রান্না ও গৃহস্থালি বিপর্যস্ত হবে-
LPG না থাকলে শহরের ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে গ্রামের হোটেল—সব জায়গায় রান্না বন্ধ। কেরোসিন না পেলে বিকল্প আলো ও স্টোভ চলবে না। মানুষ কাঠ-কয়লায় ফিরে যাবে, বন উজাড় হবে, ঘরের ভিতর ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট-ফুসফুসের রোগ বাড়বে।
৩. বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন কমে যাবে-
অনেক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, ডিজেল জেনারেটর, জাহাজ, ফার্নেস অয়েলে চলে। এগুলো বন্ধ হলে লোডশেডিং বাড়বে, কলকারখানা উৎপাদন কমাবে, কর্মী ছাঁটাই হবে। সিমেন্ট, ইস্পাত, কাচ, সার কারখানা তাপ না পেয়ে বন্ধ হবে।
৪. স্বাস্থ্য খাত ঝুঁকিতে পড়বে-
পেট্রোকেমিক্যাল ছাড়া সিরিঞ্জ, স্যালাইন ব্যাগ, গ্লাভস, ওষুধের ক্যাপসুল, ব্যান্ডেজ, পেট্রোলিয়াম জেলি তৈরি হবে না। বেনজিন-টলুইন না থাকলে প্যারাসিটামল থেকে অ্যান্টিবায়োটিক—অনেক ওষুধের উৎপাদন বন্ধ। হাসপাতালের জেনারেটর ডিজেল না পেলে অপারেশন থিয়েটার অচল।
৫. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নষ্ট হবে-
ট্রাক্টর-পাম্পসেট ডিজেল ছাড়া চলবে না। ইউরিয়া, কীটনাশক, ফসলের প্যাকেজিং—সব পেট্রোকেমিক্যাল নির্ভর। ফলন কমবে, মজুত-পরিবহন হবে না, খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।
৬. যোগাযোগ ও ডিজিটাল জীবন থমকে যাবে-
প্লাস্টিক না থাকলে মোবাইল, ল্যাপটপ, অপটিক্যাল ফাইবারের কভার, কিবোর্ড, রাউটার তৈরি বন্ধ। টেলিকম টাওয়ারের ডিজেল জেনারেটর না চললে নেটওয়ার্ক ডাউন। ব্যাংকিং, অনলাইন পড়াশোনা, ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম সব থেমে যাবে।
৭. পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব-
পলিয়েস্টার, নাইলন, রেক্সিন, বোতাম, চিরুনি, বালতি, পানির পাইপ—সব প্লাস্টিকজাত। এগুলো না থাকলে শুধু তুলা-পাট-চামড়ায় চাহিদা মিটবে না, দাম বহুগুণ বাড়বে। প্যারাফিন ওয়াক্স না থাকলে মোমবাতি, ক্রেয়ন, ফলমূলের প্রলেপ থাকবে না।
৮. অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ হবে-
বিটুমিন ছাড়া রাস্তা পিচ করা যাবে না, ছাদ ওয়াটারপ্রুফ হবে না। PVC পাইপ, ইনসুলেশন তার, রং, বার্নিশ—সব বন্ধ। বাড়ি-ব্রিজ-মেট্রোর কাজ থেমে যাবে, নগর উন্নয়ন পিছিয়ে পড়বে।
৯. কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি ধসে পড়বে-
তেল শোধনাগার, পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক, পরিবহন, প্যাকেজিং, ওষুধ—কোটি কোটি মানুষের কাজ এই শৃঙ্খলে। উপজাত না থাকলে এই খাতগুলো বন্ধ হয়ে ব্যাপক বেকারত্ব, মন্দা, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে।
১০. বিকল্পের চাপ ও পরিবেশ-
মানুষ তখন কাঠ, কয়লা, পশুর চর্বির দিকে ঝুঁকবে। বন ধ্বংস, মিথেন-কার্বন নিঃসরণ বাড়বে। বায়ো-প্লাস্টিক, ইলেকট্রিক গাড়ি, সৌরশক্তি এখনও পুরো চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত নয়। রূপান্তর সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
শেষ কথা:
ক্রুড অয়েলের উপজাত না থাকা মানে শুধু গাড়ি থেমে যাওয়া নয়, সভ্যতার চাকা উল্টো ঘোরা। খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রে সংকট নামবে। তাই বিকল্প শক্তি ও টেকসই উপাদান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই উপজাতগুলো সমাজের মেরুদণ্ড হয়েই থাকবে।

2
58 views

Comment