logo
Select Language
Hindi
Bengali
Tamil
Telugu
Marathi
Gujarati
Kannada
Malayalam
Punjabi
Urdu
Oriya

কলকাতার ঐতিহাসিক পর্যটন স্থান আলিপুর চিড়িয়াখানা, যাত্রী সাথী অ্যাপকে ধন্যবাদ। অনলাইন টিকিট প্রাপ্তির জন্য, পশ্চি

আলিপুর চিড়িয়াখানা নিয়ে আরও
(ইতিহাসের গভীরে):
আলিপুর চিড়িয়াখানা চালু হওয়ার আগে, ১৮০০ সালের দিকে কলকাতায় ‘ব্যারাকপুর মেনাজারি’ নামে গভর্নর জেনারেলের একটি ব্যক্তিগত পশুশালা ছিল। পরে সাধারণ মানুষের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য আলাদা চিড়িয়াখানা তৈরির ভাবনা আসে। কার্ল লুইস শোয়েন্ডলার নামে এক জার্মান ইলেকট্রিশিয়ান ও শৌখিন প্রাণীবিদ জমি দান করেন এবং পরিকল্পনায় সাহায্য করেন। এজন্যই একে ভারতের প্রথম ‘বৈজ্ঞানিক’ চিড়িয়াখানা বলা হয়।
(স্থাপত্য ও বিন্যাস):
চিড়িয়াখানার ভিতরে ব্রিটিশ আমলের লাল ইটের খাঁচা, লোহার রেলিং আর নতুন করে তৈরি কাঁচঘেরা এনক্লোজার পাশাপাশি আছে। বড় ঘাসজমি, শতাব্দীপ্রাচীন গাছ, আর মাঝে মাঝে জলাশয় পুরো জায়গাটাকে ছোটখাটো জঙ্গলের অনুভূতি দেয়। ‘প্রাইমেট হাউস’, ‘রেপটাইল হাউস’, ‘বার্ড এভিয়ারি’ আলাদা আলাদা করে সাজানো, যাতে প্রতিটি প্রাণী তার স্বাভাবিক পরিবেশের কাছাকাছি থাকে।
(বিশেষ আকর্ষণ):
1. সাদা বাঘ: আশির দশকে আলিপুরেই প্রথম ভারতে সাদা বাঘের প্রজনন হয়। ‘রাজা’ ও ‘রানি’ নামের দুই সাদা বাঘ তখন দারুণ জনপ্রিয় ছিল।
2. শিম্পাঞ্জি: ‘বাবু’ নামের শিম্পাঞ্জি বহু বছর কলকাতার শিশুদের প্রিয় বন্ধু ছিল। তার অঙ্গভঙ্গি দেখতে ভিড় জমত।
3. ম্যানগ্রোভ এভিয়ারি: সুন্দরবনের পাখিদের জন্য তৈরি বিশেষ এলাকা, যেখানে মানগ্রোভ গাছ লাগিয়ে প্রাকৃতিক আবহাওয়া রাখা হয়েছে।
4. নকটার্নাল হাউস: এখানে পেঁচা, লেমুর, স্লো-লোরিসের মতো রাতচরা প্রাণী দিনের বেলায় উল্টো আলো দিয়ে দেখানো হয়।
(সংরক্ষণ ও গবেষণা):
আলিপুর চিড়িয়াখানা ‘সেন্ট্রাল জু অথরিটি’র নিয়ম মেনে বিপন্ন প্রজাতির ক্যাপটিভ ব্রিডিং করে। মানস প্রজেক্টের অধীনে ব্ল্যাকবাক, মাউস ডিয়ার, ফিশিং ক্যাটের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এখানকার ভেটেরিনারি হাসপাতালে অসুস্থ বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা হয়, এমনকি বনদপ্তর উদ্ধার করা প্রাণীও এখানে সুস্থ করা হয়।
(শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড):
‘জু এডুকেশন অফিসার’রা স্কুল গ্রুপকে গাইডেড ট্যুর করান। বন্যপ্রাণ সপ্তাহ, বিশ্ব বাঘ দিবস, বিশ্ব পরিবেশ দিবসে কুইজ, বসে আঁকো, নাটক হয়। ‘জু অ্যাম্বাসেডর’ প্রোগ্রামে কলেজ পড়ুয়ারা স্বেচ্ছাসেবক হয়ে দর্শনার্থীদের সচেতন করে।
(দত্তক প্রকল্প):
যে কেউ বছরে নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে বাঘ, সিংহ, জিরাফ, এমনকি ম্যাকাও পাখিও ‘দত্তক’ নিতে পারেন। সেই টাকা প্রাণীর খাবার, ওষুধ ও এনক্লোজার উন্নয়নে খরচ হয়। দত্তক নিলে সার্টিফিকেট আর আয়কর ছাড় মেলে, আর বছরে একদিন ‘ফিডিং সেশন’ দেখার সুযোগও থাকে।
(ঘোরার টিপস)
- গরম এড়াতে শীতকাল বেস্ট, নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি।
- সকাল ৯টায় ঢুকলে ভিড় কম, পশুরাও বেশি সক্রিয় থাকে।
- সঙ্গে জল, টুপি, আরামদায়ক জুতো রাখুন। ভিতরে ব্যাটারি গাড়ি আছে, বয়স্কদের জন্য সুবিধা।
- ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তোলা, খাবার দেওয়া, জোরে আওয়াজ করা নিষেধ। নিয়ম ভাঙলে জরিমানা হয়।
(ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা):
নতুন মাস্টারপ্ল্যানে আরও খোলামেলা ‘ইমার্শন একজিবিট’ তৈরি হচ্ছে, যেখানে দর্শনার্থী ও প্রাণীর মাঝে পরিখা বা কাঁচ থাকবে, লোহার গরাদ কমবে। ডিজিটাল টিকিট, কিউআর কোডে প্রাণীর তথ্য, আর সোলার লাইট বসানোর কাজ চলছে।
আলিপুর চিড়িয়াখানা তাই শুধু ছুটির দিনের বেড়ানো নয়, কলকাতার ১৪৮ বছরের জীবন্ত ইতিহাস। বন্যপ্রাণকে ভালোবাসতে শেখা, সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝা আর শহরের মাঝে এক টুকরো সবুজ খুঁজে পাওয়ার ঠিকানা—সব একসাথে মেলে এখানে।
কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানা ভারতের প্রাচীনতম এবং অন্যতম বিখ্যাত চিড়িয়াখানা। ১৮৭৬ সালের ১লা জানুয়ারি এটি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। প্রায় ৪৬.৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই চিড়িয়াখানা আলিপুর রোডে অবস্থিত এবং পশুপ্রেমী, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।
প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিলেন তৎকালীন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল। ব্রিটিশ আমলে ইউরোপীয় ও ভারতীয় অভিজাতদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে অনেক পশুপাখি এখানে আনা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বিনোদনের পাশাপাশি প্রাণিবিদ্যা চর্চা ও সংরক্ষণ।
আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রায় ১২৬৬টি প্রাণী ও পাখি রয়েছে, যার মধ্যে ১২৬টি প্রজাতি। এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সাদা বাঘ, আফ্রিকান সিংহ, জাগুয়ার, হিপোপটেমাস, জিরাফ, জেব্রা, শিম্পাঞ্জি এবং নানা ধরনের হরিণ দেখা যায়। সরীসৃপ বিভাগে কুমির, ঘড়িয়াল, অজগর ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপ রয়েছে। পাখির মধ্যে ম্যাকাও, কাকাতুয়া, সারস, ময়ূর, পেলিকান ও পরিযায়ী হাঁস চোখে পড়ে।
এই চিড়িয়াখানার সবচেয়ে বিখ্যাত বাসিন্দা ছিল অদ্বৈত নামের দৈত্যাকার আলডাব্রা কচ্ছপ। মনে করা হয়, তার বয়স ২৫০ বছরেরও বেশি ছিল। ২০০৬ সালে তার মৃত্যু হয়। অদ্বৈতকে একসময় রবার্ট ক্লাইভের সংগ্রহের অংশ বলা হতো, যা চিড়িয়াখানার ইতিহাসকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
শিশুদের জন্য এখানে আছে শিশু চিড়িয়াখানা, যেখানে খরগোশ, গিনিপিগ, বাঁদর ও ছোট পাখি কাছ থেকে দেখা যায়। অ্যাকোয়ারিয়ামে রঙিন মাছ ও জলজ প্রাণীর সংগ্রহ রয়েছে। বিশাল জলাশয়গুলো পরিযায়ী পাখিদের আকর্ষণ করে, বিশেষ করে শীতকালে।
আলিপুর চিড়িয়াখানা শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, সংরক্ষণ ও শিক্ষার কেন্দ্রও। এখানে বিপন্ন প্রজাতির প্রজনন কর্মসূচি চালানো হয়। দত্তক নেওয়া প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও সংস্থা নির্দিষ্ট পশুপাখির খরচ বহন করতে পারে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এখানে এসে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সম্পর্কে হাতে-কলমে শেখে।
প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন। সপ্তাহান্তে ও ছুটির দিনে ভিড় বেশি হয়। প্রবেশমূল্য সাধারণের জন্য সাশ্রয়ী, আর শিশু ও ছাত্রছাত্রীদের জন্য ছাড় আছে। বৃহস্পতিবার চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। গ্রীষ্মে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা এবং শীতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা ৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে।
চিড়িয়াখানার ভিতরে ছায়াঘেরা রাস্তা, বসার জায়গা, পানীয় জল ও খাবারের স্টল রয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পশুদের সুস্থতার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়। প্লাস্টিক বর্জন, শব্দ নিয়ন্ত্রণ ও পশুদের বিরক্ত না করার নিয়ম কঠোরভাবে মানা হয়।
কলকাতা মেট্রোর যতীন দাস পার্ক বা কালীঘাট স্টেশন থেকে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। বাস, ট্যাক্সি ও অ্যাপ-ক্যাবও সুবিধাজনক। ন্যাশনাল লাইব্রেরি ও বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম কাছেই, তাই একদিনে কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘোরা যায়।
আলিপুর চিড়িয়াখানা শুধু পশুপাখি দেখার জায়গা নয়, এটি কলকাতার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নস্টালজিয়ার অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানে এসে শৈশবের স্মৃতি তৈরি করেছে। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণের প্রতি ভালোবাসা জাগাতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সংরক্ষণের বার্তা নিয়ে এটি আজও নতুন বছর, নতুন আশার মতোই আমাদের ডেকে নেয়।

5
342 views

Comment