দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ছাতার তলায় বহন করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানের সম্বন্ধে কুরুচিকর মন্তব্য হয়তো আমার শিক্ষার সাথে মেলবন্ধন করে না বলেন শিক্ষিকা চৈতালি রায়..
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা- দেশের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র এবং পরিবর্তনের ডাক! আজকের যুগে দাঁড়িয়ে আমরা যখন ডিজিটাল ইন্ডিয়া আর মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের দেশের ভবিষ্যতের বুনিয়াদ—'সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা'—কোন তিমিরে দাঁড়িয়ে আছে, তা নিয়ে ভাবলে গা শিউরে ওঠে! এটা কি শুধুই অব্যবস্থা, নাকি গরীবের বাচ্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা ছিনিমিনি খেলা? আসুন, চোখ খুলে দেখি সেই ভয়াবহ বাস্তবতা।
👉 সরকারি স্কুলের অন্দরমহল: এক জীবন্ত নরক?
শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি যে, অধিকাংশ সরকারি স্কুলের অবস্থা আজ অত্যন্ত শোচনীয়। যেখানে বাচ্ছাদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেখানে তারা প্রতিদিন লড়াই করছে ন্যূনতম বাঁচার তাগিদে।
👉 ভাঙাচোরা ক্লাসরুম ও ছাদ থেকে খসা পলেস্তারা: অনেক স্কুলে মাথার ওপর ভাঙা ছাদ, বৃষ্টি হলেই জল পড়ে। বাচ্ছারা ভয়ে ভয়ে ক্লাস করে—কখন ছাদ ভেঙে পড়বে! এটা কি পড়াশোনার পরিবেশ, নাকি কোনো ধ্বংসস্তূপ?
👉 শৌচাগারের হাহাকার: দেশের হাজার হাজার সরকারি স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার নেই, আর যা আছে তা ব্যবহারের অযোগ্য। দুর্গন্ধ আর নোংরায় ভরা। এর ফলে অনেক ছাত্রী মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এটা কি আমাদের লজ্জা নয়?
👉 পানীয় জলের অভাব: তীব্র গরমেও অনেক স্কুলে বাচ্ছাদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। বাচ্ছারা বাধ্য হয়ে নোংরা জল খায় বা তৃষ্ণার্ত থাকে। শিক্ষক আছেন, কিন্তু পড়াশোনা নেই? পরিকাঠামোর অভাবের পাশাপাশি আর এক বড় সমস্যা হলো পড়াশোনার গুণমান।
👉শিক্ষকের অভাব ও অশিক্ষক কাজ: অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। একজন শিক্ষককেই হয়তো সব বিষয় পড়াতে হয়। তার ওপর নির্বাচনের ডিউটি, জনগণনা ইত্যাদি অ-শিক্ষক কাজের চাপে তাঁরা পড়ানোর সময় পান না।
👉ধুঁকতে থাকা পড়াশোনার মান: একাধিক রিপোর্টে দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র ঠিকমতো দ্বিতীয় শ্রেণীর বই পড়তে পারে না! এই শিক্ষা দিয়ে তারা জীবনে কী করবে? তারা কি শুধুই সস্তার শ্রমিক হয়ে থেকে যাবে?
👉 ভারত সরকারের পর্যাপ্ত সহযোগিতা সত্যও, প্রত্যেক স্কুলের পরিকাঠামো অনুযায়ী নির্দিষ্ট কম্পিউটার আছে, কিন্তু কম্পিউটার পড়াশোনার মান এতটাই নিম্নমানের মাধ্যমিক পর্যন্ত সরকারি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের কম্পিউটারের শিক্ষা যথেষ্ট নিম্নমানের।
💡 সমাধানের পথ:
...জীভাম এডুকেশন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট গঠিত হয় ২০০৭ সালে সম্পূর্ণ সরকারি সাহায্যে। নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী এবং ন্যূনতম পারিশ্রমিকের মাধ্যমে এবং সততার সাথে কর্মীবৃন্দের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে আজ গন্তব্যে পৌঁছেছে ঠিকই, কিন্তু কিছু সংখ্যক কর্মী ছাড়া সকলের কাছেই অসন্তুষ্টির অভিযোগ এবং কাজের শৃঙ্খলাবোধ এর অভাব লক্ষ্য করা যায়, যা সত্যি লজ্জনীয়।
দীর্ঘ 18 বছর পরিশ্রমের সফলতা যে রকম আনন্দ দিয়েছে, দুঃখ দিয়েছে বেশ কিছু ভালো কর্মী যারা প্রতিষ্ঠান থেকে নিজের কিছু ব্যক্তিগত কারণ থাকার দরুন অন্যত্র চলে গেছেন।
যারা দীর্ঘদিন দশ বছর বা ১৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের সাথে বটবৃক্ষের মতো জড়িত তারা সততার চোখ দিয়ে ভালোবাসার প্রতিষ্ঠানের কোন দোষ হয়তো দেখতে পায় না, কিন্তু অনেকের মন্তব্যই 18 বছরের শেষ প্রান্তে এসে, বেশ কিছু দোষ-গুণ চোখে পড়ে, যা যথেষ্ট নাড়া দেয়। যে প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ছাতার তলায় বহন করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানের সম্বন্ধে কুরুচিকর মন্তব্য হয়তো শিক্ষার সাথে মেলবন্ধন করে না। তাই আজও গর্বের সাথে পুরনো কর্মীরা বলে এখানে আমরা যারা- যারা এখনো পর্যন্ত বর্তমান, তারা প্রত্যেকেই সুসম্মানে স্বল্প পরিকর কাজের ভিত্তিতে যে পারিশ্রমিক পাই, তাতে প্রত্যেকেই হয়তো খুশি। আর যারা কাজ না করে অধিক পারিশ্রমিকের আশায় বসে থাকেন, তাদের হয়তো ধারণাটা ভুল। পৃথিবীর কোন সংস্থা নেই, কাজ না করেও মূল্য পাওয়া যায়, একমাত্র আমাদের প্রতিষ্ঠান ছাড়া।
কর্মীরা আশাবাদী যারা অধিক পারিশ্রমিকের বিনিময় নিজের শ্রম দিয়ে থাকে, তাদের নির্দিষ্ট ফলস্বরূপ শ্রম যদি প্রত্যেকদিন দায়িত্ব সহকারে দেওয়া যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি অনেক বড় হতে পারে এবং আমাদের সমস্যার সমাধান হতে পারে, তত সহ অভিযোগ কম থাকতে পারে।
ধন্যবাদ জানান প্রতিষ্ঠানের প্রবর্তক এবং সম্পূর্ণ টিমকে, পরিচালক মন্ডলীকে, বিশেষভাবে স্যারকে, যার পরিচালনায়, ভালোবাসায় আজ অনেকেই দীর্ঘ বছর অতিক্রম করেছে প্রতিষ্ঠানের জোয়ার-ভাটার সাথে, তিনি কোনদিন ভাবেননি নিজের স্বার্থের কথা, নিজের লভ্যাংশের কথা। তিনি চিরজীবন যখন প্রতিষ্ঠান আটকেছে শুধু মূল্যই দিয়েছেন নিজের পারিশ্রমিকের টাকা থেকে। আমার জানা আজ পর্যন্ত উনি বা ওনারা কেউ পারিশ্রমিক বাবদ একটা টাকাও নেয়নি ব্যক্তিগত ভাবে মাসিক সেলারি হিসেবে। যা উনার আইনত প্রাপ্য। লভ্যাংশের কিছু অংশ আমাদের স্বার্থে উনি কিছুদিন আগেই রিটারমেন্ট ভাতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যেটা আমাদের কাছে খুবই আনন্দের। কিন্তু প্রতিষ্ঠান যদি নিয়মিত লাভজনক না থাকে, তাহলে সেটা কিভাবে দেওয়া সম্ভব সেটাও আমার কাছে বিশেষ চিন্তার এবং আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখার বিষয়। কৃতজ্ঞতা জানান সেইসব কর্মীকে যাদের আপ্রাণ চেষ্টায় আজও প্রতিষ্ঠানটি সগৌরবে ১৯ বছরের পা দিয়েছে। এবং আগামী দিনে প্রত্যেকের সহযোগিতায় উজ্জ্বল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে খড়দহের নক্ষত্রে পরিণত করা একমাত্র কাম্য। তাই বন্ধু হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়, সমস্যা থাকবে তার সমাধানও হবে, হাতে-হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়াই একমাত্র লক্ষ্য।ধন্যবাদ সবাইকে, ধন্যবাদ স্যার কে। শিক্ষিকা-চৈতালি রায়।।