ত্রিপুরার ইতিহাস ও জনতত্ত্ব: অপপ্রচারের মেঘ বনাম ঐতিহ্যের সূর্য।
খোয়াই: একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার সঠিক ইতিহাস। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে ত্রিপুরার জনতাত্ত্বিক কাঠামোকে কেন্দ্র করে এক গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার তাগিদে একদল কুচক্রী এই রাজ্যের শান্ত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশকে বিষিয়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে যে, ত্রিপুরায় বসবাসকারী বাঙালি মানেই ১৯৭১-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে এবং সরকারি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এক অকাট্য ও ভিন্ন সত্য বেরিয়ে আসে—যা প্রমাণ করে বাঙালিরা এই রাজ্যে কোনোভাবেই ‘বহিরাগত’ নয়, বরং তারা এই মাটিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।শতাব্দী প্রাচীন সহাবস্থান: পরিসংখ্যান কী বলে?ত্রিপুরার রাজন্য আমল থেকেই বাঙালি এবং জনজাতিদের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান। ১৯০১ সালের আদমশুমারির দিকে তাকালে দেখা যায়, সেই সময়েই রাজন্য শাসিত ত্রিপুরায় অ-জনজাতি বা বাঙালিদের হার ছিল ৪৭.১১ শতাংশ। ১৯৪১ সাল পর্যন্ত এই অনুপাত প্রায় ১:১ (জনজাতি ৫০.০৯% ও বাঙালি ৪৯.৯১%) বজায় ছিল। অর্থাৎ, দেশভাগ বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কয়েক দশক আগে থেকেই বাঙালিরা এই রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ছিল। মাণিক্য রাজাদের শাসনামলে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষিকাজের প্রসার এবং শিক্ষার আলো ছড়াতে বাঙালিদের সসম্মানে এই রাজ্যে ঠাঁই দেওয়া হয়েছিল। সুতরাং, বাঙালিরা এই রাজ্যের নবাগত কোনো অতিথি নয়, তারা যুগ যুগ ধরে জনজাতি ভাইবোনদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই রাজ্যের সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে।১৯৭১-এর মানবিকতা ও বাস্তবতার অপব্যাখ্যা। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ত্রিপুরার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। মানবিকতার খাতিরে সেই সময় লক্ষ লক্ষ বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল এই রাজ্য। ঐতিহাসিক সত্য হলো, সেই সময় প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা শরণার্থীদের মধ্যে শুধু বাঙালিরাই ছিল না, ছিল বহু জনজাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও। যুদ্ধের পর জনসংখ্যার একটি বড় লাফকে আজ একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল এমনভাবে পরিবেশন করছে যেন এর আগে এই রাজ্যে বাঙালিদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। এই বিকৃত ইতিহাস পরিবেশনের উদ্দেশ্য একটাই—বাঙালি সমাজকে মানসিকভাবে কোণঠাসা করা এবং জনজাতি ও বাঙালিদের মধ্যে অবিশ্বাসের দেওয়াল তুলে দেওয়া।। আজকের যুবসমাজকে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সত্যকে জানতে হবে। কারো প্ররোচনা বা আবেগতাড়িত কোনো উস্কানিতে পা দিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া চলবে না। ইতিহাসের দলিল বলছে, ১৯ শতকের বহু আগে থেকেই বাঙালিরা এই রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যারা রাজন্য আমলের ইতিহাস জানেন, তারা জানেন যে রাজদরবারের ভাষা থেকে শুরু করে সংস্কৃতির পরতে পরতে বাঙালির অবদান মিশে আছে।এই সংকটকালে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপরও বড় দায়িত্ব বর্তায়। কোনো যাচাই না করে বা একতরফা তথ্য পরিবেশন করে বিভ্রান্তি ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। ইতিহাসকে তার সঠিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচার করে সংবাদ পরিবেশন করা আজ সময়ের দাবি। ত্রিপুরার ভূমিপুত্র হিসেবে বাঙালি ও জনজাতি—উভয় সম্প্রদায়েরই সমান মর্যাদা ও ইতিহাস রয়েছে। উপসংহারে বলা যায়,ত্রিপুরা মানেই সম্প্রীতির এক অনুপম উদাহরণ। এখানে ককবরক আর বাংলা ভাষা একই সুরের ছন্দে কথা বলে। যারা এই সুরে তাল কেটে দিতে চাইছে, তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। ‘বহিরাগত’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীকে ছোট করা মানে ত্রিপুরার গৌরবোজ্জ্বল রাজন্য ইতিহাসকেই অস্বীকার করা। সত্য জানুন, সচেতন হোন এবং ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দিয়ে ত্রিপুরার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে রক্ষা করুন।